বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি : ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ভালো সাবজেক্ট?

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেই টেনশন ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ভালো সাবজেক্ট ভর্তি হবেন। ভাবতে না ভাবতেই শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে হয় ভর্তিযুদ্ধে। ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ভালো সাবজেক্ট প্রাধান্য দেবেন। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে ভর্তি প্রস্তুতির কিছুটা তারতম্য থাকায় অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় কেউ মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর কেউ কেউ আবার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য ইউনিট বা অনুষদ ভিত্তিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। ধরা যাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার কথাই। এখানে মূলত চারটি ইউনিটে পরীক্ষা হয়ে থাকে। যেমন বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘এ’ বা ‘ক’ ইউনিট, সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের জন্য ‘বি’ বা ‘খ’ ইউনিট, ব্যবসায় স্ট্যাডিজ অনুষদের জন্য ‘সি’ বা ‘গ’ ইউনিট এবং সর্বশেষ বিভাগ পরিবর্তনের জন্য ‘ডি’ বা ‘ঘ’ ইউনিট। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা আলাদা আলাদা অনুষদের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। কিন্তু কাংখিত সাবজেক্ট বা পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন।

ভর্তি পরীক্ষায় দেখা যায় অনেকেই একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটে চান্স পেয়ে যান। এক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা দেখা দেয়, ওই শিক্ষার্থীর ভর্তি নিয়ে। সে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। অনেক সময় দেখা যায় ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার পছন্দ মত সাবজেক্ট পান না। সেক্ষেত্রে তার করণীয়ই বা কী? তবে শিক্ষাবিদদের এ ক্ষেত্রে মত সেই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাবজেক্টটাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে ভর্তি হওয়া। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই প্রত্যেক শিক্ষার্থী চিন্তা করেন আমার এই সাবজেক্ট পছন্দ। অর্থাৎ তার কোন বিষয়ে পড়ার আগ্রহ বা ভালোলাগা থেকেই কোন বিশেষ সাবজেক্টে পড়ার আগ্রহ জন্ম নেয়। তাই সেই পছন্দের বিষয়ে পড়তে পারলেই তার জ্ঞান বেশি বিকশিত হবে বলে মনে করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ নাকি সাবজেক্ট

এ বিতর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সবসময়ই দেখা দেয়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অনেকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে রাখেন। কিন্তু ক্যারিয়ার এক্সপার্টদের মত, অনেকে সময় ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেও ভালো সাবজেক্টে পড়তে না পারায় এক ধরণের বিষন্নতা কাজ করে। অর্থাৎ ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সাবজেক্ট ভালো না হওয়ায় মনে প্রফুল্লতা কাজ করে না। এক ধরণের মনঃকষ্ট থেকেই যায়। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত পেছনে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সেই সাবজেক্টে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করে ভালো ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়। যা চাকরির বাজার বা জব মার্কেটে গুরুত্ব বহন করে। এজন্য আপনার যদি আগে থেকেই টার্গেট ফিক্সড করা থাকে আপনি কোনটি চান ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ভালো সাবজেক্ট। যদি আপনার টার্গেট ফিক্সড করা থাকে তাহলে ভালো বিষয়ে ভর্তি হতে পারেন।

আর যদি টার্গেট ফিক্সড করা না থাকে অর্থাৎ যে কোন বিষয়ে পড়লেই চলবে কিন্তু ভালো বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে। তাহলে ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়কেই প্রাধান্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার ক্যারিয়ার হিসেবে আপনি কি চান বা নিজেকে কোথায় দেখতে চান সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। আপনার যদি কোন সাবজেক্ট নিয়ে প্যাশন থাকে এবং মনে করেন আপনি সেই সাবজেক্টে ভর্তি হলে ভালো করবেন তবে সেটাই করা উচিত। তবে আপনার টার্গেট যদি হয় বিসিএস তবে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হতে পারলেও সমস্যা নেই। আপনি যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাধারণ বিষয়ে ভর্তি হয়ে খুব ভালোভাবে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভালো সাবজেক্ট বা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কোন ব্যাপার না।

বিশ্ববিদ্যালয় কোন ফ্যাক্ট না

আপনার যদি সিজিপিএ ভালো না হয় তবে চাকরির দাতার কাছে আপনার মেধার মূল্যায়ন হবে না। হ্যাঁ আপনার সিজিপিএ ভালো না হলেও আপনি যত ভালো বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েন না কেন আপনি অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাবেন। হয়ত ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে আপনি অনেক বিষয়ে স্কীল ডেভেলপমেন্ট করতে পারেন কিন্তু স্কীল ডেভেলপমেন্ট যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়েও করতে পারেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে গুরুত্ব না দিয়ে সাবজেক্টকে গুরুত্ব দিয়ে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করাই শ্রেয়। তবুও কথা থেকেই যায়, অনেকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় দেখেই ভর্তি হন না।

পারিপার্শ্বিক সুবিধা-অসুবিধা দেখেও বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করেন। ধরুণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই। একজন শিক্ষার্থী যদি দুই বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পেয়ে যায় তবে ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক বিষয়ই প্রাধান্য পাবে। থাকা-খাওয়া, বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব, পরিবারের ইচ্ছা, টিউশনি করার সুবিধা, চাকরির প্রস্তুতি নেয়ার সুবিধা, চাকরির পরীক্ষা দেয়ার সুবিধা, ভালো গাইডলাইন বা মেন্টর পাওয়ার সুবিধা। এসব সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবজেক্ট শুধু নয় পারিপার্শ্বিক অনেককিছুই মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

আপনার মন কি চায় তা শুনুন

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সবার আগে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিন। অর্থাৎ আপনার মন কি চায় তা শুনুন, বুঝুন। আপনার মন যদি চায় আপনার ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং ভালো সাবজেক্টে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা তবে তাই করুণ। এজন্য আপনি দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিষয়ে চান্স পেয়েছেন তাদের সম্পর্কে জানুন। বিশ্ববিদ্যালয় দুটোর সাবজেক্ট সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিন। কোন সেশনজট আছে কি-না তা জানুন। বিভাগের ফলাফল কেমন হবে সেটাও জানুন। শুধুমাত্র পরিবার বা সিনিয়দের কাছ থেকে না শুনে মনের চাওয়াটাকেও প্রাধান্য দিন। কেননা পড়তে হবে আপনাকেই তাই সিদ্ধান্ত আপনার।

এর মানে আপনি কারো কথা শুনবেন না বিষয়টা এমন নয়। আপনি তাদের থেকে পরামর্শ নিন। আপনি কেন এই সাবজেক্টে ভর্তি হতে চান তার কারণ তাদের জানান। আর তারাই বা কেন আপনাকে এই সাবজেক্টে ভর্তি হতে বলছেন না তা শুনুন। এবার সিদ্ধান্ত নিন আপনার জন্য কোনটা ভালো হবে। অবশ্যই মনের বৈপরীত্যে গিয়ে কোন সাবজেক্টে ভর্তি হবেন না। এতে আপনার মনে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ রয়ে যাবে। আপনার যদি মনে হয় ভালো সাবজেক্টের থেকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আপনার ক্যারিয়ার ভালো হবে। তাইলে দেরি না করে তাই করুণ। কারণ দিন শেষে আমরা সবাই চাই একটা সুন্দর ক্যারিয়ার বা হ্যান্ডসাম জব।

পছন্দের সাবজেক্টের জব মার্কেটে চাহিদা

প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে জব মার্কেট এনালাইসিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভর্তির হয়ে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই আগেই চিন্তাভাবনা করে নিতে হবে আপনি যে সাবজেক্টে ভর্তি হতে চাচ্ছেন তার ভবিষ্যৎ চাহিদা বা সম্ভাবনা কেমন। কেননা জব মার্কেটে সাবজেক্ট ভ্যালু রয়েছে। প্রত্যেক সাবজেক্টের আলাদা আলাদা চাহিদা রয়েছে। তাই জব মার্কেট জানতে চাকরির পত্রিকা এবং অনলাইন চাকরি বিষয়ক ওয়েবসাইট দেখুন। সেখানে আপনার সাবজেক্টের চাহিদা যাচাই করুণ। কারণ চাকরিদাতারা অনেক সময় কিছু পোস্টের বা পদবির জন্য নির্দিষ্ট কিছু সাবজেক্ট সিলেক্ট করে দেয়। আপনার সাবজেক্ট সেই লিস্টে আছে কিনা জেনে নিন। সেই সাথে সিনিয়রদের সাথে পরামর্শ করুণ আপনার সাবজেক্টের জব মার্কেটে চাহিদা কেমন। সেইসাথে জেনে নিন যারা এখন চাকরির জন্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে তাদের থেকে।

কোন সাবজেক্টে ভর্তি হলে ভালো হবে। শুধু ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েই ভর্তির সিদ্ধান্ত না নিয়ে সার্বিক বিষয়ে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই শ্রেয়। আপনার সাবজেক্টের জব মার্কেটে চাহিদা না থাকলে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও আপনি খানিকটা পিছিয়ে থাকবেন। যদি বর্তমান সময়ে চাকরির পরীক্ষায় সবাই অংশ নিতে পারেন। যারা চাকরির পরীক্ষায় ভালো করেন তারা প্রিলিমারি পরীক্ষা বা লিখিত পরীক্ষায় টিকেও যান। সব সাবজেক্টের চাকরি প্রার্থীরা একসাথে চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ভাইভা বা সাক্ষাৎকারে সময় আপনার সাবজেক্ট এবং আপনার রেজাল্ট একটা বড় ফ্যাক্ট হিসেবে কাজ করবে। সেক্ষেত্রে আপনার সাবজেক্ট যদি ভালো হয় তবে আপনি অন্যদের থেকে নিঃসন্দেহে এগিয়ে থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *