বিতর্ক চর্চা করবেন কেন?

বিতর্ক চর্চা করবেন কেন? কারণ আমরা প্রতিনিয়তই বিতর্ক করি নিজেদের সাথে।   ধরুণ পোষাক কিনতে গিয়ে কোন রঙের পোষাকটি আমি বাছাই করবো, তা ভাবতে নিশ্চয়ই আমাদের মাথায় আসবে, কেন এটা আমার সাথে যায়, কেন ওটা আমার সাথে যায় না।  আপনি তপ্ত রোদের মধ্যে কেন বাইরে যাবেন বা যাবেন না। কয়েকটি কারণ নিশ্চয়ই আপনার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। যেটি সবথেকে শক্তিশালী যুক্তি বা কারণ সেটিকে মেনে নিয়েই আপনি একটি সিদ্ধান্তে উপনিত হন।

যুক্তির এই খেলাটিকেই আমরা বিতর্ক বলতে পারি।  কতগুলো যুক্তির মধ্যে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্যতা সম্পন্ন যুক্তি বাছাই করা এবং অন্যের মতামতকে সম্মান জানিয়ে,  সবথেকে সুন্দর এবং বস্তুনিষ্ঠ যুক্তিটিকে মেনে নেবার প্রবণতাই বিতর্কের অনন্য বৈশিষ্ট্য।   সেজন্য যদি বলা হয় বিতর্কের সংজ্ঞা কি?  সহজকথায়, বিতর্ক একটি রক্তপাতহীন যুক্তির যুদ্ধ, যা একটি শিল্প যা যৌক্তিক মূল্যবোধের বার্তা জানায়। কেন বিতর্ক চর্চা করবেন কেন?   এমন প্রয়োজনীয়তা আছে বিতর্কের।   এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো আজকের আলোচনায়।

বিতর্ক নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত করে

বিতর্ক চলাকালীন দলীয় সমন্বয় ব্যতীত কোন দল বিজয়ী হতে পারেনা।   বিতর্কের সময় নিজ দলের মধ্যে সমন্বয় আর দলীয় কেসে অটুট থেকে বিতর্ক চালিয়ে যাওয়ার বৈশিষ্ট্যগুলো একজন বিতার্কিককে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে সহায়তা করে।   কি করে অল্প সময়ের মধ্যে নিজ দলকে প্রস্তুত করতে হয়,  বিরোধী দলের দলীয় কৌশল কেমন হতে পারে, কিভাবে সামনে আগত চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা করতে হতে পারে তার পূর্বপ্রস্তুতি নেয়ার অভ্যাস,  একজন বিতার্কিককে ভালো নেতা ও ভালো একজন যোদ্ধা হিসেবে প্রস্তুত করে।

সমৃদ্ধ জ্ঞান চর্চা

অধ্যয়ন ব্যতীত ভালো বিতর্ক সম্ভব নয়।   ভালো বিতার্কিক হতে হলে চলমান সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন প্রভৃতিসহ জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা শাখা নিয়ে ভাবতে হয় ,পড়তে হয়।   জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু সম্পর্কে আপডেটেড থাকতে হয়।   আর এই অধ্যয়নগুলো একজন বিতার্কিককে নিঃসন্দেহে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় সমৃদ্ধ করে।

উপস্থাপন দক্ষতা

দশজন মানুষের সামনে গুছিয়ে কথা বলা চারটেখানি কথা নয়।   জড়তা, গলা কাপা, কখনো বা শরীর কাঁপা ইত্যাদি সমস্যা নিয়েই হয়তো একজন বিতার্কিকের বিতর্কে হাতেখড়ি হয়।   কিন্তু নিয়মিত বিতর্ক করতে করতে একজন বিতার্কিক হয়ে উঠে তুখোড় বক্তা, ভালো একজন উপস্থাপক।   ক্লাসে অনেকজন শিক্ষার্থীর মাঝে যখন একজন বিতার্কিক প্রেজেন্টেশন দেয় নিঃসন্দেহে ভীতি থেকে দূরে থেকেই,  সে তার প্রেজেন্টেশনটিকে সুন্দর করে উপভোগ্য করে তুলতে পারে,  দর্শক ও শ্রোতাদের মনকে আকৃষ্ট করতে পারে।

উপস্থিত বিচক্ষণতা

কোন বিষয় বা প্রস্তাবের উপর বিতর্ক করতে হলে সেই বিষয়ের উপর সম্যক ধারণা  এবং  প্রস্তুতি নেয়া অত্যাবশ্যক। পূর্বপ্রস্তুতির পাশাপাশি বিতর্ক চলাকালীন অন্যতম হাতিয়ার হলো, বিতার্কিকের উপস্থিত বিচক্ষণতা যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের কঠিন যুক্তিটিকেও সহজভাবে খণ্ডন করে দেয়া যায়।  একজন বিতার্কিকের এই স্কিলটি হয়তো কোন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় লিখিত অংশে বা ভাইভা বোর্ডে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে সাহায্য করে।

প্রমিত ভাষাচর্চা

সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করার পাশাপাশি,  একজন বিতার্কিকের যে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয় তা হলো প্রমিত ভাষার ব্যবহার।  আঞ্চলিকতা বা অন্য ভাষার সংমিশ্রণ বর্জন করে বিতর্ক করতে হয়, কেননা বিতার্কিককে মূল্যায়নের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার ও শুদ্ধ উচ্চারণ।  সেজন্য বিতর্ক চর্চা প্রমিত ভাষার ব্যবহারে আমাদেরকে উৎসাহিত করে।

বিতার্কিকের আলাদা একটি পরিচয়

একজন বিতার্কিক নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হয়ে বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে।  নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হয়ে কোন অর্জন,  একজন বিতার্কিককে এনে দেয় অনন্য মর্যাদা।  তাছাড়া অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে তুলনা করলে তার এই স্কিলটি তাকে সবার থেকে ভিন্ন একটি পরিচয় দিবে।  সেজন্য এক্সট্রা কারিকুলাম হিসেবে খেলাধুলা, গান, আবৃতি, নৃত্য ইত্যাদির মতোই বিতর্কও একটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় যা একজন শিক্ষার্থীকে দক্ষ করে তুলে অন্যদের থেকে।

ভিন্ন মতকে সম্মান জানানো

বিতর্কের অনিন্দ্য সুন্দর দিকটি হলো এই শিল্প আপনাকে পরমত সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। বলা হয় ভালো একজন বক্তা হতে হলে আপনাকে প্রথমত হতে হবে, একজন ভালো শ্রোতা।  অন্যের বক্তব্য মন দিয়ে শোনা, তার মতামতকে সম্মান জানানো এবং গ্রহণযোগ্য যুক্তিকে মেনে নেয়ার প্রবণতা একজন বিতার্কিককে পরমত সহিষ্ণু ও যৌক্তিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আরও পড়তে পারেন- প্যাশন অর্থ বুঝে প্যাশন খুঁজুন

একটি ভালো বিতর্ক একটি ভালো গবেষণাও বটে

একটি গঠনমূলক বিতর্কে যদি কোন সমস্যা এবং তার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয় তবে সমস্যাটির পিছনের কারণ, সম্ভাব্য সমাধানগুলো কি কি, বাস্তবায়নে বাধাগুলো কি কি এমন নানাবিধ অনুষঙ্গ নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ করা হয়।  সেজন্য উভয়পক্ষের ভালো একটি বিতর্ক চলমান যেকোন সমস্যা নিয়ে ফলপ্রসু একটি গবেষণাও বটে।

সময়জ্ঞান

বিতর্কের জন্য একজন বিতার্কিককে নির্দিষ্ট একটি সময় বেঁধে দেয়া হয় বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য।  এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজের বক্তব্যকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে উপস্থাপন করার অভ্যাসটি বিতার্কিকদের সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে সচেতন করে তুলে।

বিতর্ক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শেখায়

যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে বিতার্কিকেরা তার সমাজ বা রাষ্ট্র কেমন চলছে তা নিয়ে ভাবতে শিখে। এই ভাবনায় ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অভ্যাস বিতার্কিকদের অনন্য করে তুলে। বলা যায় যুক্তির সৈনিক হিসেবে বিতার্কিক সমাজের মধ্যে লুকিয়ে আছে আগামীদিনের রাষ্ট্রনায়ক, পলিসি মেকার, গবেষক, শিক্ষাবিদসহ উদীয়মান নানা পেশার মানুষ। যারা যুক্তিবাদী সমাজ বিনির্মাণে দৃঢ় প্রত্যয়ী। বিতর্কের গুরত্ব অপরিসীম। তাই সময় এসেছে আমাদের সমাজকে যুক্তিবাদী করে গড়ে তোলার। এজন্য পাঠ্যপুস্তকে বিতর্ককে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

 

-লেখক
তরিকুল ইসলাম পিয়াস
সভাপতি,
বেগম রোকেয়া ইউনিভার্সিটি ডিবেট ফোরাম( বিআরইউডিএফ)।
জয়েন্ট অর্গানাইজিং সেক্রেটারি( ডিবেট),
ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ(এনডিএফবিডি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *